বিদায় হজ্জের ভাষণ

বিদায় হজ্জের ভাষণ

 আরবি দশম হিজরী সনে রাসূল (সাঃ)-এর বিদায় হজ অনুষ্ঠিত হয়। লক্ষাধিক সাহাবি উপস্থিত ছিলেন। যে কোন আদর্শিক নেতার জীবনের সর্বশেষ কর্মী সম্মেলনে দেওয়া ভাষণ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কেবল নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন শেষনবী ও বিশ্বনবী। অধিকন্তু তাঁর দৃঢ় আশংকা ছিল যে, এটাই তাঁর জীবনের সর্বশেষ হজ্জ ও সর্বশেষ বিশ্ব সম্মেলন। আর নবী জীবনের পরিপূর্ণতা সাধিত হয়েছে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর বিদায় হজ্জের ভাষণে।

আল্লাহ তাআলা মহানবী (সাঃ)-কে প্রেরণ করেছেন দ্বিন ইসলামকে বিজয়ী ও পূর্ণতা দানের জন্য। যখন দ্বিন ইসলাম বিজয় ও পূর্ণতা লাভ করে তখন তিনি তাঁর বিদায়ের কথা অনুভব করেন।

দশম হিজরীতে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার সাহাবির সামনে জিলহজ মাসের ৯ তারিখ বিকালে আরাফাতের ময়দানে যে বক্তব্য পেশ করেন এবং পরদিন ১০ জিলহজ ঈদের দিন ও কোরবানির দিন প্রদান করেছিলেন। এই দুইদিনে দেওয়া তাঁর বক্তব্য বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক ভাষণ হিসেবে পরিচিত। 

তাই তিনি হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা)-কে ইয়েমেনের গভর্নর নিযুক্ত করে প্রেরণকালে বলেছিলেন, ‘হে মুয়াজ, সম্ভবত এ বছরের পর আমার সঙ্গে তোমার আর সাক্ষাৎ হবে না। হয়তো তুমি আমার মসজিদ ও আমার কবরের পাশ দিয়ে গমন করবে।’

প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর ঐতিহাসিক বিদায় হজ্জের ভাষণ :


১. হে জনতা, আমার কথাগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনো, আমি জানি না, এবারের পর তোমাদের সঙ্গে এ জায়গায় আর একত্র হতে পারব কি না।

২. হে মানবমণ্ডলী, স্মরণ রাখো, তোমাদের আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। তোমাদের আদি পিতা একজন, অনারবদের ওপর আরবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তদ্রূপ সাদার ওপর কালোর কোনো প্রাধান্য নেই। আল্লাহ ভীতিই শুধু শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার মানদণ্ড।

৩. তোমাদের পরস্পরের রক্ত ও ধন-সম্পদ আজকের দিন, এ মাস এবং এ শহরের মতো পবিত্র।

৪. শোনো, জাহেলিয়াতের সব কিছু আমার পদতলে পিষ্ট করা হয়েছে। জাহেলিয়াতের রক্তের দাবিও রহিত করা হলো।

৫. জাহেলি যুগের সুদ রহিত করা হলো। আমাদের মধ্যকার প্রথম যে সুদ আমি রহিত করছি তা হলো, আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিবের সুদ। এখন থেকে সব ধরনের সুদ হারাম করা হলো।

 

৬. স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা আল্লাহর আমানতস্বরূপ তোমরা তাদের গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর কলেমার মাধ্যমে হালাল করা হয়েছে। তাদের ওপর তোমাদের অধিকার রয়েছে যে তারা তোমাদের বিছানায় এমন কাউকে স্থান দেবে না, যাদের তোমরা পছন্দ করো না।

তারা এরূপ করলে প্রহার করতে পারো। তবে কঠোর প্রহার করবে না। তোমাদের ওপর তাদের অধিকার হলো, তোমরা যথাযথ অন্ন-বস্ত্র প্রদান করবে।

৭. আমি তোমাদের কাছে এমন দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা দৃঢ়ভাবে ধারণ করলে পথভ্রষ্ট হবে না। একটি হলো আল্লাহর কিতাব আর অন্যটি হলো আমার সুন্নাহ।

৮. হে জনতা, মনে রেখো, আমার পরে কোনো নবী নেই। তোমাদের পরে কোনো উম্মত নেই। ফলে তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করবে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবে, রমজানের রোজা রাখবে, স্বেচ্ছায় ধন-সম্পদের জাকাত দেবে, আল্লাহর ঘরে হজ করবে, শাসকের আনুগত্য করবে।
যদি তোমরা এসব পালন করো, তাহলে তোমাদের রবের জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে (ইবনে মাজাহ)।

৯. হে মানবমণ্ডলী, পিতার অপরাধে পুত্র দায়ী হবে না এবং পুত্রের অপরাধে কোনো পিতাকে দায়ী করা হবে না।

১০. তোমাদের সঙ্গে আমার সম্পর্কের প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা হবে। তোমরা তখন কী বলবে? সাহাবায়ে কেরাম প্রত্যুত্তরে বলেন, আমরা সাক্ষ্য দেব যে আপনি দ্বিনের দাওয়াত দিয়েছেন, আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, ন্যস্ত দায়িত্ব পালন করেছেন।

মহানবী (সাঃ) এ কথা শুনে শাহাদাত আঙুল আকাশের দিকে উত্তোলন করে লোকদের দিকে ঝুঁকিয়ে তিনবার বলেন, হে রব, আপনি সাক্ষী থাকুন (সহিহ মুসলিম)

১১. প্রত্যেক মুসলমান ভাই ভাই। তোমরা তোমাদের দাস-দাসী সম্পর্কে সতর্ক থাকবে। তোমরা যা খাবে তাদেরও তা খেতে দেবে। তোমরা যা পরিধান করবে তাদেরও তা পরতে দেবে। তাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেবে। শাস্তি দেবে না।

১২. হে মানবজাতি, ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করবে না। কেননা অতীতের অনেক জাতি এ বাড়াবাড়ির কারণে ধ্বংস হয়েছে। উপস্থিত ব্যক্তিদের দায়িত্ব হবে আমার এ কথাগুলো অনুপস্থিত লোকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।





মহানবী (সাঃ) ভাষণ শেষ করলেন। এবং তাঁর চেহারা মোবারক উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি করুণ স্বরে করুণভাবে আকাশ পানে তাকালেন এবং তিনি বললেন, ‘হে মহান প্রভু! হে পরওয়ার দিগার! আমি কি তোমার দীনের দাওয়াত পরিপূর্ণভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছি। তখন উপস্থিত জনতা সবাই সম্মিলিতভাবে বললেন, নিশ্চয়ই আপনি আপনার দীন পরিপূর্ণভাবে পৌঁছাতে পেরেছেন।‘ তখন তিনি আবার বললেন যে, ‘হে প্রভু! আপনি শুনুন, আপনি সাক্ষী থাকুন, এরা বলেছে আমি আপনার দীনকে লোকদের নিকট পৌঁছাতে পেরেছি। আমি আমার কর্তব্য পালন করতে পেরেছি।

ভাবের আতিশয্যে নবী নীরব হলেন। জান্নাতি নূরে তাঁর চেহারা আলোকদীপ্ত হয়ে উঠল। এই মুহূর্তে কুরআনের শেষ আয়াতটি নাজিল হয়। ‘আজকের এই দিনে তোমাদের দীনকে পূর্ণ করে দিলাম। তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত পূর্ণ করে দিলাম। ইসলামকেই তোমাদের ওপর দীন হিসেবে মনোনীত করলাম।’

হযরত রাসূল (সাঃ) কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। জনতাও নীরব। কিছুক্ষণ পর হযরত (সাঃ) জনতার দিকে তাকালেন এবং করুণ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন বিদায় বন্ধুগণ, বিদায়।

হজরত রাবিয়া ইবনে উমাইয়া ইবনে খালফ জনতার কাছে উচ্চকণ্ঠে বিদায় হজ্জের ভাষণ এর বাণী পৌঁছে দেন (ইবনে হিশাম)।

(আল-কোরআন, পারা: ৬, সূরা-৫ মায়িদাহ, আয়াত: ৩)। (বিশ্বনবী, গোলাম মোস্তফা; সীরাতুন নবী (সা.), ইবনে হিশাম (র.), খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৭৩-২৭৭; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসীর (র.), খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১৯৮ ও ৩২০-৩৪২, ই. ফা. বা.)।


ইহুদী জাতির ইতিহাস

ইহুদী জাতির ইতিহাস

 ইহুদী ও ইসরাইল- এ শব্দ দুটো কোথাও পড়লে, কিংবা দেখলেই ধর্মীয় অনুভূতিগতভাবেই হোক আর যে কারণেই হোক, বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেন। এর পেছনে কারণ কী?

কারণটা নিহিত রয়েছে ঐতিহাসিক কিছু দ্বৈরথ, ইহুদী ষড়যন্ত্র আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের সদস্য ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাইল কর্তৃক নিরীহ ফিলিস্তিনিদের উপর নির্মম নির্যাতন- এ সব কিছুর মাঝে। তাছাড়া গাজা বা পশ্চিম তীরের সংঘাত এবং অতি সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলের রাজধানী তেলআবিবের বদলে পবিত্র জেরুজালেমকে ঘোষণা করায় এই ইহুদী বিদ্বেষ স্বাভাবিকভাবেই আবার দেখা যায় সাধারণ মুসলিমদের মাঝে।কিন্তু এ তো গেলো মুদ্রার এক পিঠ। অন্য পিঠে কী আছে? ফিলিস্তিনিরা নির্যাতিত হচ্ছে এটা সর্বজনবিদিত, কিন্তু ইসরাইলের দৃষ্টিকোণটা এখানে কী? ইহুদীরা কীসের ভিত্তিতেই বা জেরুজালেমকে নিজেদের দাবী করে? কীসের জোরে তারা বিশ্বাস করে এই পবিত্র ভূমি কেবলই তাদের? যদি ইহুদীদের দিক থেকে এরকমটা না করা হতো তবে এই সংঘাতের সৃষ্টি হতো না। তাই অরাজকতা, অস্থিরতা, অন্যায়- যে নামেই এ পরিস্থিতিকে ডাকা হোক না কেন, এর পেছনের গভীর কারণ লুকিয়ে আছে ইহুদী জাতির ইতিহাসে, যে ইতিহাসটা তারা নিজেরা বিশ্বাস করে।পাঠকদের জন্য একদম গোড়া থেকে ধীরে ধীরে এ ঐতিহাসিক সিরিজে তুলে ধরা হবে মুসলিম ও ইহুদীদের দৃষ্টিকোণ থেকে এই জাতির ইতিহাসকে, যে জাতি ‘বনী ইসরাইল’ নামেও পরিচিত। শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ নয়, পবিত্র ভূমি দখলের আড়ালের বিশ্বাসটুকু জানতেও সাহায্য করবে এ সিরিজটি। হযরত ইয়াকুব (আ) থেকে শুরু করে একদম হযরত ঈসা (আ) এর আগ পর্যন্ত (অর্থাৎ খ্রিস্টধর্ম প্রচার শুরু হবার আগপর্যন্ত) ঘটনাগুলো তুলে ধরা হবে, মুদ্রার দু’পিঠ থেকেই। পবিত্র কুরআনতাফসির ইবনে কাসিরে যে ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা করা আছে, সে একই ঘটনাগুলো ইহুদীরা কীভাবে দেখে? যে ঘটনাগুলো তাফসিরে বা মুসলিমদের পবিত্র গ্রন্থগুলোতে নেই, সেই শূন্যস্থান আমরা পূরণ করব ইহুদীদের নিজস্ব ঘটনা দিয়ে, যেগুলোর মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যাবে, তারা কেন জেঁকে বসেছে পবিত্র ভূমিতে। এ সিরিজে জানা যাবে অলৌকিক সিন্দুক ‘তাবুত-এ-সাকিনা’ বা ‘আর্ক অফ দ্য কোভেন্যান্ট’ এর বিস্তারিত- এ ব্যাপারে কুরআন এবং ইহুদী গ্রন্থ কী বলে? মূসা (আ), ইউশা (আ), দাউদ (আ), সুলাইমান (আ) থেকে ঈসা (আ) পর্যন্ত কী কী ঘটনা ঘটেছিল যার মাধ্যমে পবিত্র ভূমির ভবিষ্যৎ রূপরেখা তৈরি হয়? মিসর থেকে লোহিত সাগর বিভক্ত করে কীভাবে ইসরাইল জাতি মুক্তি পেয়েছিল? পবিত্র ভূমিতে পৌঁছাবার আগে কেন বছরের পর বছর তাদের মরুভূমিতে শাস্তি পেতে হয়েছিল? পরবর্তীতে কেন এবং কীভাবে ইহুদীরা নির্বাসিত হয় পবিত্র ভূমি থেকে, কী ছিল তাদের দোষ? কেন তারা ঈসা (আ) বা যীশু খ্রিস্টকে অস্বীকার করেছিল? তারা বিশেষ কার প্রতীক্ষায় ছিল? কীভাবে নির্মিত হলো বাইতুল মুকাদ্দাস? আর এখন এ ভূমিতে এতদিন পরে ফিরেই বা ইহুদী জাতির কী যায় আসে?এ প্রশ্নগুলোর উত্তর অল্প অল্প করে আমরা বের করবার চেষ্টা করব ইসলামি উৎসগুলোর পাশাপাশি ইহুদী বিশ্বাসের তাওরাত ও অন্যান্য নবীদের নিয়ে লেখা পুস্তক থেকে; এছাড়াও আমরা ঘেঁটে দেখব ইহুদী ব্যাখ্যা সম্বলিত গ্রন্থসহ হিব্রু বাইবেল বা তানাখ আর তাদের আইনগ্রন্থ তালমুদেও এ ব্যাপারে কিছু রয়েছে কিনা।

‘ইহুদী’ বা বহুবচন ‘ইহুদীম’ (יְהוּדִים‎‎) শব্দটি হিব্রু। সেমেটিক ধর্মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো ধর্ম হল ইহুদী ধর্ম (Judaism)। অনেকে প্রশ্ন করে থাকেন, ইহুদীদের ইংরেজিতে Jew বলে কেন? আরামায়িক শব্দ ‘ইয়াহুদাই’ (Y’hūdāi) থেকে গ্রিক শব্দ Ioudaios আসে। হিব্রুতে উচ্চারণ ‘এহুদী’ বা ‘ইহুদী’। আর এরপরে শব্দের শুরুর Y স্বরবর্ণ ইউরোপীয় ভাষায় J দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। সে হিসেবে ইহুদী –> জিহুদি –> জিউ (জ্যু)। মূল ইয়াহুদাই শব্দের আক্ষরিক অর্থ আসলে ‘যে বাস করে এহুদিয়া প্রদেশে’, কিন্তু সেই এহুদিয়া-র হিব্রু ‘হুদা’ অর্থ আসলে ‘যে নিজেকে সমর্পণ করে’ (আরবি ‘মুসলিম’ শব্দের অর্থও একই)। এহুদা ছিলেন হযরত ইয়াকুব (আ) বা ইসরাইল (আ) এর চতুর্থ পুত্র। তাঁর বংশধরেরা থাকতেন সেই প্রদেশে। তবে পারিভাষিকভাবে, বনী ইসরাইলকেই ইহুদী বলা হয়। সত্যি বলতে, ‘ইহুদী’ যতটা না ধর্মপরিচয়, তার চেয়ে বেশি বংশপরিচয় কিংবা জাতিপরিচয় (Ethnicity)। এ কারণে, একজন ইহুদী নাস্তিক হতেই পারেন, কিন্তু যেহেতু তিনি ইসরাইলের বংশধর, সেজন্য বংশগত বা জাতিগতভাবে তিনি ইহুদী নামেই পরিচিত হবেন।মূলত ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে এই ভূমি দখলের সমস্ত পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের পক্ষবাদী যে ইহুদীরা তাদেরকে জায়নবাদী বা জায়োনিস্ট (Zionist) বলে। উনিশ শতকের শেষ দিকে শুরু হওয়া এ জায়োনিজমের বাস্তবিক প্রয়োগ আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি, এর প্রতিষ্ঠাতা থিওডোর হার্জল নামের একজন ইহুদী। জায়োনিজম শব্দটা এসেছে জায়োন থেকে। জায়োন বা সিওন হলো জেরুজালেমের একটি টিলা, বাইতুল মুকাদ্দাস যে টেম্পল মাউন্টে অবস্থিত তারই দক্ষিণ অংশ। এ জায়গাটা জেরুজালেমের পবিত্রতম জায়গা বিধায় জায়ন শব্দ দিয়েই জেরুজালেম বা ‘সিটি অফ ডেভিড (দাউদ)’-কে বোঝানো হয়। এক্ষেত্রে, জায়োনিজম আন্দোলন হলো ‘জায়ন’ বা ইহুদীদের ‘জেরুজালেম’ পুনরুদ্ধার আন্দোলন, বৃহত্তর অর্থে পুরো পবিত্র ভূমি অধিকার করে নেয়া। এই পবিত্র ভূমি বলতে আসলে কী বোঝায় সেটা আমরা এ সিরিজে ধীরে ধীরে অগ্রসর হলেই জানতে পারব। তবে এ সিরিজের টপিক নিয়ে পাঠকদের মনে প্রশ্ন থাকবেই অনেক, যেগুলোর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন পর্বে উত্তর দেয়া হবে; প্রশ্নগুলো জ্ঞানপিপাসী পাঠকেরা কমেন্ট সেকশনে করতে পারেন।কিন্তু এ জায়োনিস্টদের নিন্দিত কর্মের জন্য এমনকি নিরীহ ইহুদী পরিবারদেরও ফলাওভাবে ঘৃণা করা হয়, যারা হয়ত এ মতবাদ সমর্থন করে না। যেমন নিচের ছবিতে ইহুদীদের দেখা যাচ্ছে এই মৌলবাদী গোঁড়া জায়োনিজমের প্রতিবাদ করতে।সবচেয়ে পুরনো সেমিটিক ধর্ম হলেও ইহুদীদের সংখ্যা কিন্তু খুবই কম, তবে অনেক প্রভাবশালী জায়গাতেই তাদের অবস্থান রয়েছে। ইসরাইল ন্যাশনাল নিউজ ডট কমের সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে ইহুদী জনসংখ্যা ১৪৪ লক্ষ। অর্থাৎ বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ০.২% !! এর মাঝে ৬৩ লক্ষ ইসরাইলে আর বাকিরা বাকি দেশগুলো মিলিয়ে- প্রধানত আমেরিকা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড আর কানাডায়। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার ৭৫% হলো ইহুদী।

ইহুদীরা মুসলিমদের মতই বংশ পরম্পরা হিসেব করে হযরত ইব্রাহিম (আ) থেকে। অর্থাৎ পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ)। ইব্রাহিমের (আ) প্রধান ২ ছেলে ইসমাইল আর ইসহাক (ইহুদী তাওরাত অনুযায়ী ইব্রাহিম (আ) এর পরে আরো ছয় পুত্র হয় তৃতীয় স্ত্রী কেতুরার গর্ভে)। এর মাঝে, হযরত ইসহাক (আ) (ইংরেজিতে Isaac) এর ছেলে ছিলেন ইয়াকুব (আ) (Jacob)। ইয়াকুব (আ) এর আরেক নাম ছিল ইসরাইল (আ); এ নামটাই ইহুদীরা গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ ইয়াকুব (আ) থেকেই আমাদের এই ইতিহাস শুরু হবে। তবে এই ‘ইতিহাস’ কিন্তু কেবলই ধর্মীয় ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় এগুলো তেমন আমলে আনা হয় না। একদমই যে কিছু পাওয়া যায়নি তা নয়, তবে এত আগের খুব কম জিনিসই পাওয়া গিয়েছে।ইহুদীদের বর্তমান ভাষা হিব্রু, যদিও দু’হাজার বছর আগে ঐ অঞ্চলে আরামায়িক ছিল কথ্য ভাষা, হিব্রু প্রধানত লিখবার ভাষা (ফর্মাল)। হিব্রুকে তারা বলে ‘পবিত্র ভাষা’; আনুমানিক ২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত হিব্রুর ব্যবহার ছিল ভালই। কিন্তু এরপর প্রায় ১৬টি শতাব্দী জুড়ে হিব্রু ছিল কেবলই একটি মৃত ভাষা। কিন্তু ১৮৮১ সালে এলিয়েজার বিন ইয়াহুদা (Eliezer Ben-Yehuda) এ মৃত ভাষাকে পুনর্জীবিত করবার কাজ শুরু করেন এবং বিংশ শতকের প্রথমদিকে পুরোপুরি চালু হয়ে যায় হিব্রু। এখন ইসরাইলের একটি রাষ্ট্রভাষা হিব্রু। মুসলিমদের পবিত্র ভাষা আরবি ও ইহুদীদের পবিত্র ভাষা হিব্রু দুটোই সেমিটিক ভাষা হবার কারণে এদের মাঝে অনেক মিল। দুটোই ডান থেকে বামে লিখা হয়। তবে আরবিতে ২৯/৩০টি বর্ণ থাকলেও হিব্রুতে মাত্র ২২টি বর্ণ; তবে আরবির চেয়ে হিব্রুতে স্বর উচ্চারণ বেশি করা যায়।‘বেসিক’ যতটুকু জানবার সেটা তো জানা হলোই, আর এছাড়াও যা যা জানবার প্র


য়োজন হবে সেগুলো জায়গা মতো উল্লেখ করা হবে। এবার কাহিনীতে প্রবেশ করবার পালা। তবে দেরি না করে এখনই শুরু করা যাক, হারিয়ে যাওয়া যাক বহু আগের মধ্যপ্রাচ্যে, যখনও ইহুদী শব্দটির প্রচলন হয়নি!

খ্রিস্টের জন্মের প্রায় সতেরশ বছর আগে। ‘বীরশেবা’ নামের এক মরুঅঞ্চল থেকে রওনা দিলেন মানুষটি। গন্তব্য তাঁর ‘হারান’, সেখানে তাঁর যাত্রাবিরতি নেবার পরিকল্পনা।হারানে পৌঁছালেন যখন তখন সূর্য ডুবে গিয়েছে। রাতের বেলা তিনি ভ্রমণ না করবার সিদ্ধান্ত নিলেন। যেখানে আছেন সেখানেই একটা পাথর যোগাড় করে মাথার নিচে দিয়ে শুয়ে পরলেন। আর ঘুমে তলিয়ে গেলেন পরক্ষণেই।

একটা খুবই অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে তাঁর হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। তিনি নিজেই স্বপ্নের কথা মনে করে বলে উঠলেন, “জানতাম না আমি, এটা ঈশ্বরের জায়গা!” তিনি জায়গাটার নাম দিলেন ‘বেথেল’। ‘বেথ’ মানে হিব্রুতে ঘর, আর ‘এল‘ হলো ঈশ্বর/আল্লাহ। তাই বেথেল মানে ‘ঈশ্বরের ঘর’। আর মানুষটির নাম? হযরত ইয়াকুব (আ)।

ইহুদীদের তাওরাত ও তাফসিরে ইবনে কাসিরে এ ঘটনাটি বলা আছে। কিন্তু কী ছিল সে স্বপ্ন যা দেখে তাঁর এটা মনে হলো? আর কীভাবেই বা এরপর কাহিনী গড়িয়ে তাঁর ছেলে হযরত ইউসুফ (আ) মিসরের এক দাস থেকে মিসর শাসকের ডান হাত হয়ে গিয়েছিলেন? তার চেয়েও বড় কথা, পবিত্র কুরআনে যেখানে বনী ইসরাইলকে তৎকালীন ‘সেরা জাতি’ (বাকারা ২:৪৭ ও ২:১২২) বলা হয়েছিল, এত উচ্চ স্থান থেকে কীভাবে তাদের পতন শুরু হয়? ইসলাম ও ইহুদী ধর্ম উভয় অনুযায়ীই বা কী করেছিল তারা?